
কক্সবাজারে গত কয়েক বছরে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সমুদ্রভাঙন। একসময় যে সৈকতে ছিল বিস্তীর্ণ বালুচর, পর্যটকদের কোলাহল ও সারি সারি ঝাউগাছ, সেখানে এখন আছড়ে পড়ছে সাগরের ঢেউ। ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ দেওয়া হলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফল। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাশাপাশি ঝুঁকিতে পড়েছে পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও জীবিকা।
কক্সবাজার সৈকতে ৩২ বছর ধরে ব্যবসা করছেন মফিজুর রহমান। তাঁর চোখের সামনেই গত কয়েক বছরে সাগরে বিলীন হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট বালুচর। ভাঙন ঠেকাতে বছরের পর বছর জিওব্যাগ দেওয়া হলেও থামছে না সাগরের আগ্রাসন।
একেকটি ঢেউ আছড়ে পড়ার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সৈকতের চেনা চেহারা। কোথাও কয়েক ফুট, আবার কোথাও আরও বেশি জায়গা চলে যাচ্ছে সাগরের গর্ভে। অথচ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বালিয়াড়িই ছিল ঢেউয়ের বিরুদ্ধে সৈকতের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভাঙন ঠেকাতে এখন সেই বালিয়াড়ির জায়গায় বসানো হয়েছে জিওব্যাগ।
তবে ঢেউয়ের আঘাতে জিওব্যাগও দীর্ঘদিন টিকছে না। কোথাও বস্তা ছিঁড়ে গেছে, কোথাও সরে গেছে জায়গা থেকে। আবার কোথাও জিওব্যাগের নিচ থেকে বালু সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে ফাঁকা জায়গা। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার জিওব্যাগ দিয়ে আদৌ এই ভাঙন ঠেকানো সম্ভব কি না।
স্থানীয়রা বলেন, জিওব্যাগ দেওয়া হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। বরং এতে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবছর জিওব্যাগের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা কার্যত পানিতে যাচ্ছে। বালু রক্ষার নামে জিওব্যাগ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে বস্তা সরে গিয়ে ভাঙন আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি অপরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ধ্বংসও ভাঙন বাড়ার অন্যতম কারণ। জিওব্যাগ সাময়িক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
সমুদ্রবিজ্ঞানী আবদুল কাইয়ুম বলেন, অন্য জায়গা থেকে বালি এনে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ভরাট করা যেতে পারে। এরপর নিশি, কেয়া ও আইপোমিয়া সাগরলতা লাগিয়ে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এভাবে জায়গাটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পর্যটন করপোরেশন কাজ করতে পারে।
এদিকে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি বলেন, কোন কোন এলাকায় ভাঙন রোধ করা প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে কাজ করা হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, অস্থায়ীভাবে প্রতিবছর যে বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা দিয়ে জরুরি এলাকাগুলোতে বালি, জিওব্যাগসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সৈকতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা চালানো মানুষের এখন একটাই দাবি—সমুদ্রভাঙনের স্থায়ী সমাধান। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে বালিয়াড়ি ও সৈকত সংকুচিত হতে থাকলে শুধু কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, হুমকির মুখে পড়বে পর্যটননির্ভর অর্থনীতিও।